পদ্মা সেতুতে ঘুরে দাঁড়াবে বাগেরহাটের পর্যটন শিল্প

বাংলাদেশের ৩ টি বিশ্ব ঐতিহ্যের দু’টি বাগেরহাটে। ষোড়শ শতাব্দীতে খানজাহান আমলে নির্মিত বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ।

ইসলামী স্থাপত্য রীতির মসজিদ গুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৮৫ সালে বাগেরহাটকে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসেবে ঘোষনা এবং ৩২১তম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে ইউনেস্কো। সম্প্রতি ‘ওয়ার্ড মনুমেন্ট ওয়াচ’ তালিকায় প্রত্নতাত্বিক শহর হিসেবে দেশে একমাত্র বাগেরহাট বিশ্বের ২৫টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার মধ্যে স্থান পায়। এছাড়া নতুন করে আরও ১৬৩টি প্রত্নতাত্বিক শনাক্ত করেছে প্রত্নতাত্বিক অধিদপ্তর।

অপরটি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। যা বিশ্বেও সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। অপার এ বিশ্বয়ের নাম ‘সুন্দরবন। তবুও গাঢ় সবুজে ঘেরা এ জনপদ পর্যটন শিল্পে সীমাহীন বঞ্চনার শিকার। যার অন্যতম প্রধান কারণ অনুন্নত যোগাযোগ। ভারসাম্যহীন এই পর্যটন শিল্পে একমাত্র স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। পর্যটন শিল্পে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। তাই ‘পদ্মা সেতু’কে কেন্দ্র করে এবার নতুন আশার আলো দেখছেন পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ী-সহ সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাগেরহাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য যাতায়াতের প্রধান ব্যবস্থা হচ্ছে সড়ক পথ। আর এই সড়ক পথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসা-বানিজ্যে পন্য পরিবহনে যাতায়াতে মাওয়া-ঘাটে যানজট, প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকাসহ নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হত। সময় মতো পৌছানো যেত না গন্তব্যে। তবে পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে চিরচেনা সেই যাত্রা একেবারেই পাল্টে যাবে দক্ষিনের জেলা বাগেরহাটের। ঘুরে দাড়াবে সম্ভাবনাময় বাগেরহাটের পর্যটন শিল্প। সরকারের রাজস্ব বাড়বে কয়েকগুন।

বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ ও সুন্দরবন দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহের শেষ নেই। প্রায় সারাবছর এখানে পর্যটক আসেন। তবে বাগেরহাট আসতে পদ্মা ঘাটে অশেষ বিড়ম্বনার কারনে ইচ্ছা থাকলেও পর্যটকরা সহজে আসতে পারতেন না। যে কারণে এখানে পর্যটনস্পট গুলোর আশপাশে উন্নত মানের কোনো হোটেল-মোটেল আজও গড়ে ওঠেনি। পদ্মা সেতু চালুর পর এ সমস্যা গুলো আর থাকবে না বলে তাঁরা দৃঢ় আশাবাদী। পদ্মা সেতু চালু হলে বাগেরহাটের পর্যটন শিল্পে অভুতপূর্ব পরিবর্তন হবে। বেকারত্ব ঘুচবে অসংখ্য যুবার। রাজস্ব আয় বাড়বে বহুগুণ।

বাগেরহাট খানজাহান আলী (রঃ) মাজার এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী উন্নয়নকর্মী মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, পর্যটন মৌসুম ছাড়া বাগেরহাটে পর্যটকদের আনাগোনা কম থাকে। ফলে হোটেল ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হন। পদ্মা সেতু খুলে দিলে, বছর জুড়ে পর্যটকদের আগমন ঘটবে বাগেরহাটে। চাপ থাকবে হোটেল-মোটেল গুলোতে। নতুন নতুন হোটেল-মোটেল তৈরী হবে, বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও রাজস্ব বাড়বে।”

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, সুন্দরবনের ৪ টি রেঞ্জের ২ টি বাগেরহাট জেলায়। শরণখোলা ও চাঁদপাই। এখানে পর্যটকদের আকর্ষনের শেষ নেই। পদ্মা সেতু খুলে দেয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই চাপ বাড়বে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনে। এ কারনে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও পশ্চিম সুন্দরবনে তৈরী করা হচ্ছে চারটি নতুন পর্যটনস্পট। নতুন এ পর্যটনস্পট গুলোতে দেশি-বিদেশী পর্যটকরা সুন্দরবনের রূপ-বৈচিত্র উপভোগ করার পাশাপাশি বাড়তি আনন্দ পাবেন বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, পর্যটন শিল্পের বিকাশে পূর্ব শর্ত হচ্ছে উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সুন্দরবনে দর্শনার্থীদের আগমন কম ছিলো। তবে পদ্মা সেতু চালু হলে এ সমস্যা আর থাকবে না। দেশি-বিদেশী পর্যটকরা সহজে সুন্দরবনে আসতে পারবেন। এ কারনে পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে সুন্দরবনের সুন্দরবনে মোট চারটি নতুন ট্যুরিস্ট স্পট তৈরী করা হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে যে ট্যুরিস্ট স্পট গুলো রয়েছে সে গুলো ওয়াচ টাওয়ার, ফুট ট্রেইলার, গোল ঘর ও পাবলিক টয়লেটসহ অবকাঠামগত নানা উন্নয়নের কাজ চলছে।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, কেবলমাত্র ষাটগম্বুজ মসজিদ বা সুন্দরবন নয়, বাগেরহাটে দেখারমত অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে। ইউনেস্কো বাগেরহাটকে মসজিদের শহর ঘোষনা করেছে। এখন পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে। বাগেরহাটের ঐতিহ্য দেশি-বিদেশী মানুষের কাছে আরও পরিচিত করতে আমাদের সকলের এগিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিড়ম্বনার কারনে বাগেরহাট ভ্রমনে দর্শনার্থীদের আগ্রহ কিছুটা কম ছিল। এখন স্বপ্নের পদ্মা সেতু সেই সম্ভবনার দ্বার উন্মোচন করে দেবে, সমাপ্তি ঘটবে বিড়ম্বনার। সহজে বাগেরহাটে আসতে পারবেন পর্যটকরা।

তাই দেশি-বিদেশী পর্যটকদের কাছে বাগেরহাটকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলতে সরকারি ভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পর্যটন করপোরেশনের অর্থায়নে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ৬ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি তিন তারকা মানের হোটেল নির্মাণের কাজ প্রায় ৮০ ভাগ শেষ হয়েছে। ষাটগম্বুজ মসজিদের সামনে বিশ্রামাগার নির্মাণ, মসজিদ সংলগ্ন ঘোড়াদিঘিকে নান্দনিক করতে ওয়াকওয়ে তৈরি করা-সহ নানা কাজ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১শ জনকে ট্যুরিস্ট গাইড হিসাবে প্রশিক্ষন দেয়া হচ্ছে। এছাড়া, ব্যক্তি উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন শিল্পের নানা স্থাপন তৈরীতে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এখানকার মানুষের জীবন-জীবীকার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।”